হৃদরোগের ঝুকি থেকে সহজে মুক্তি পেতে চান। করুন এই কাজগুলি।

প্রত্যেক বছর সমগ্র বিশ্বের বহু সংখ্যক মানুষ নানা ধরনের রোগের কারণে মারা যান। তবে এক সমীক্ষায় প্রকাশিত রিপোর্ট অনুসারে জানা গিয়েছে যে, সমগ্র বিশ্বে প্রত্যেক বছর যত সংখ্যক মানুষ মারা যান তার ৩১ শতাংশ মানুষের হৃদরোগের কারণে মৃত্যু ঘটে। ইতিমধ্যেই এই পরিসংখ্যান জনসম্মুখে আসায় কিভাবে হৃদরোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব তা জানার জন্য আগ্রহী সাধারণ মানুষ। তবে হৃদরোগ থেকে মুক্তি পেতে চাইলেও হৃদরোগের আসল কারণ কি তা সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষই জানেন না। এমনকি বহু সংখ্যক মানুষই জানেন না যে তাদের দৈনন্দিন জীবনের কয়েকটি ছোট ছোট অভ্যাসে পরিবর্তন আনলেই অত্যন্ত সহজে হৃদরোগ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। আর তাই আজকের এই পোস্টে আমরা হৃদরোগের আসল কারণ থেকে শুরু করে হৃদরোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কি কি করণীয় তা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য আলোচনা করতে চলেছি।

কি কি কারণে হৃদরোগের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়:-

বিশেষজ্ঞদের মতানুসারে, যে সমস্ত মানুষ অত্যন্ত অল্প বয়সেই ধূমপানের নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েন এবং নিয়মিতভাবে অত্যন্ত তেল, চর্বিযুক্ত খাবার খেয়ে থাকেন তারা খুব তাড়াতাড়ি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। অন্যদিকে রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড এবং কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি পেলেও হৃদরোগের সম্ভাবনা অত্যন্ত পরিমাণে বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও অনেক ক্ষেত্রেই হৃদরোগের পারিবারিক ইতিহাস থাকার কারণে একজন ব্যক্তি অত্যন্ত সহজেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন। এর পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা আরও জানিয়েছেন যে, যে সমস্ত ব্যক্তিদের ডায়াবেটিস মেলিটাস, স্থূলতার মতো রোগ রয়েছে তারা অত্যন্ত সহজেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। নাগরিকদের সুবিধার খাতিরে আরো জানিয়ে রাখি যে, যেসকল ব্যক্তিদের অ্যালকোহল গ্রহণের প্রবণতা অত্যন্ত বেশি এবং যারা সারাদিনই খুবই কম পরিশ্রম করেন তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট বেশি।

হৃদরোগ থেকে মুক্তির উপায় কি?

হৃদরোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বেশ কতগুলো নিয়ম মেনে চলতে হবে। এর পাশাপাশি প্রত্যেকদিন কিছু বিশেষ খাবার গ্রহণ এবং অতিরিক্ত তেল, মশলা যুক্ত খাবার বর্জন করার মাধ্যমে আপনিও হৃদরোগ থেকে মুক্তি পেতে পারেন। হৃদরোগ মুক্তি পাওয়ার জন্য যে যে পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করবেন তা হলো:

১. প্রতিদিনের খাবারে কিছু বিশেষ পরিবর্তন করুন:- আপনি যদি প্রতিনিয়ত অত্যন্ত তেল, চর্বিযুক্ত খাবার খেয়ে থাকেন তবে যত দ্রুত সম্ভব তা বর্জন করুন এবং এইসমস্ত খাদ্যের বদলে আপনার প্রতিদিনের খাবারে ওটমিল, রাজমা, লেবু, আপেল সহ যেকোনো মরশুমি ফল, ছোট মাছ, শাকসবজি -এর মতো খাদ্য দ্রব্যগুলি যুক্ত করুন। এই সমস্ত খাদ্যে থাকা দ্রবণীয় ফাইবার রক্তের কোলেস্টেরলের শোষণ কমাতে সাহায্য করে। এর পাশাপাশি বেশি করে আঁশযুক্ত, মাখন কিংবা চিজ -এর মত স্যাচুরেটেড ফ্যাটগুলি আপনার খাদ্য তালিকা থেকে বাদ দিন। ডিপ ফ্রাই করা খাবারের বদলে ভিটামিন ও মিনারেলসমৃদ্ধ খাবার খান। স্যামন মাছ, আখরোট এবং ফ্ল্যাক্স সিড -এর মত ওমেগা -3 ফ্যাটি অ্যাসিড সমন্বিত খাবার খান। এছাড়াও খাবারের নুনের পরিমাণ কমিয়ে ফেলার মধ্যে দিয়ে আপনি হৃদরোগ থেকে মুক্তি পেতে পারেন।

২. ধূমপান, তামাক এবং অ্যালকোহল বর্জন করুন:- অনেকেই মনে করেন ধূমপানের কারণে শুধুমাত্র ক্যান্সার হয় কিন্তু তা নয়। ধূমপানের কারণে মানব দেহের রক্তনালী দিয়ে রক্ত সঞ্চালনের পথ ছোট হয়ে যায়, যার ফলে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। শুধুমাত্র ধূমপান এবং তামাক বর্জনের মধ্যে দিয়ে হৃদরোগের সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ কমানো যেতে পারে। এছাড়াও, তামাক এবং ধূমপান ত্যাগ করলে আপনার শরীরে এইচডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে যা আপনার শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। অন্যদিকে আপনি যদি অ্যালকোহলে আসক্ত হয়ে থাকেন তবে তা আপনার হার্টের জন্য মোটেই ভালো নয়। প্রতিনিয়ত অ্যালকোহল পান করলে শরীরে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা ক্রমাগত হারে বৃদ্ধি পেতে থাকে, এতে হৃদরোগের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অন্যদিকে অ্যালকোহল পানের সময় যে সমস্ত জাঙ্ক ফুড খাওয়া হয়ে থাকে তা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সম্ভাবনাকেও অনেকাংশই বাড়িয়ে দেয়। সুতরাং হৃদরোগ থেকে মুক্তি পেতে এবং সুস্থ জীবন যাপনের জন্য ধূমপান, তামাক ও অ্যালকোহল বর্জন করুন।

আরও পড়ুন:- কৃষক বন্ধু প্রকল্প নিয়ে উঠে এলো গুরুত্বপূর্ণ আপডেট। জেনে নিন এখনই।

৩. প্রতিদিন ব্যায়াম করুন:- হৃদরোগের সম্ভাবনা কমাতে প্রতিদিন অন্ততপক্ষে ৩০ মিনিট ব্যায়াম করুন। আপনি বাড়িতেই প্রত্যেকদিন ব্যায়াম অভ্যাস করতে পারেন, এছাড়াও আপনার সুবিধা অনুসারে যোগা ক্লাস কিংবা জিম জয়েন করতে পারেন। ব্যায়ামের ফলে একদিকে যেমন আপনার মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকবে অন্যদিকে ঠিক তেমনভাবেই ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকবে, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমবে। সুতরাং প্রত্যেকদিন অন্ততপক্ষে ৩০ মিনিট ব্যায়াম করলে আপনার মানসিক স্বাস্থ্য এবং শারীরিক স্বাস্থ্য উভয়েই সুরক্ষিত থাকবে। এর পাশাপাশি কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের মত বিষয়গুলি নিয়ন্ত্রণে থাকার কারণে হৃদরোগের সম্ভাবনাও কমবে। তবে আপনি যদি প্রতিদিন নিয়ম করে ব্যায়াম না করতে পারেন তবে আপনার বাড়িতে কিংবা পার্কে অথবা রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করুন।

৪. ওজন স্বাভাবিক রাখুন:- ক্রমাগত হারে ওজন বৃদ্ধির ফলে হৃদরোগের সম্ভাবনা বাড়তে থাকে। ওজন বৃদ্ধির ফলে যেকোন ব্যক্তির রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি পায়, যা শরীরের পক্ষে খুবই ক্ষতিকারক। তাই প্রতিনিয়ত প্রচুর ফল, সবজি, বাদাম, বীজ, গোটা শস্য খাওয়ার মাধ্যমে এবং ব্যায়াম করার মাধ্যমে আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকলে কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা কমবে যা আপনাকে সুস্থ থাকতে সাহায্য করবে।

৫. প্রত্যেকদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমান:- সুস্থ থাকার জন্য প্রত্যেক দিন পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমের অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রত্যেকদিন অন্ততপক্ষে ৬ ঘন্টা না ঘুমালে আপনার শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে, ফলত আপনার শরীরে ইনসোমনিয়া, হাইপারটেনশনের মত রোগ বাসা বাঁধবে। এছাড়াও মানসিক চাপ অত্যন্ত বৃদ্ধি পেলেও হৃদরোগের লক্ষণ দেখা যায়। সুতরাং প্রত্যেক দিন পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার চেষ্টা করুন। যথাসম্ভব কম চাপ নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করুন, যা আপনার মানসিক চাপকে অনেকাংশেই কমিয়ে দেবে। প্রয়োজনে মানসিক চাপ কমাতে ধ্যান করুন কিংবা যোগ ব্যায়াম করুন। এর ফলে হৃদরোগের সম্ভাবনাও অনেকাংশে কমবে।

উপরোক্ত বিষয়গুলি থেকে বলা যায় যে, প্রত্যেকদিন সুষম খাবার খাওয়ার মধ্যে দিয়ে এবং ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরলের মত রোগগুলি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে দিয়ে হৃদরোগের সম্ভাবনা অনেকাংশই কমিয়ে ফেলা যায়।