রাজ্য সরকারের প্রকল্প, শিশুর জন্মের পরই সবুজশ্রী প্রকল্পের আওতায় মিলবে উপহার স্বরুপ গাছ

সভ্যতার আদিম যুগ থেকে সময় যত এগিয়েছে মানুষও তত উন্নত হয়েছে আর তার সাথে উন্নত হয়েছে সমাজ। যার ফলে মানুষ ক্রমান্বয়ে শহরমুখী হয়ে উঠেছে এবং ধীরে ধীরে নগরায়ণের খাতিরে বন কেটে শহর বানিয়েছে। আর সময়ের সাথে সাথে ক্রমাগত হারে বিশ্বব্যাপী নগর বা শহরের প্রসারের কারণে সমগ্র বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী মানুষকে নানাভাবে সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে ক্রম প্রসারিত নগরায়ণের কারণে একদিকে যেমন বিশ্ব উষ্ণায়ন বাড়ছে অন্যদিকে ঠিক তেমনভাবেই বাড়ছে দূষণের পরিমাণও, যার কারণে প্রকৃতি থেকে নানাবিধ প্রাণী বিপন্ন হয়ে চলেছে। আর সঠিক সময় সঠিক পদক্ষেপ না গ্রহণ করা হলে একদিন মানবশিশু পৃথিবীতে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে না।

এইসকল বিষয়গুলি মাথায় রেখে প্রকৃতি এবং বিশ্বকে রক্ষার স্বার্থে বিভিন্ন দেশের তরফে নানাবিধ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের তরফেও স্বচ্ছ ভারত অভিযান, প্রধানমন্ত্রী শৌচালয় যোজনা, উজ্জ্বলা যোজনার মত বেশ কিছু প্রকল্প কার্যকর করা হয়েছে যার আওতায় প্রকৃতিকে সুরক্ষিত করার জন্য এবং দূষণ কমানোর জন্য নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে নয়, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের তরফেও এমন এক প্রকল্প কার্যকর করা হয়েছে যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ প্রকৃতিকে সুরক্ষিত রাখার জন্য উদ্যোগী হবেন। আজ্ঞে হ্যাঁ, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে রাজ্য সরকারের তরফে কার্যকরী এই বহুমুখী প্রকল্পটি হল সবুজশ্রী প্রকল্প। সমগ্র রাজ্যের সাধারণ মানুষের মাধ্যমে সবুজ বাংলা গড়ে তোলাই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে কার্যকরী এই প্রকল্পের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য।

চলুন তবে প্রথমেই সবুজশ্রী প্রকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জেনে নেওয়া যাক:-

রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে জানা গিয়েছে যে, এই সবুজশ্রী প্রকল্পটি বন দপ্তর, পঞ্চায়েত ও পল্লী উন্নয়ন দপ্তর এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের যৌথ সহযোগিতায় পরিচালিত হয়ে থাকে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১৬ সালে সবুজশ্রী প্রকল্প নামে এই বহুমুখী পরিকল্পনার উদ্বোধন করেন, যার মাধ্যমে রাজ্যের প্রতিটি নবজাতক সহ সমগ্র রাজ্যে সাধারণ জনগণ প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে উপকৃত হবেন। রাজ্য সরকারের তরফে জারি করা তথ্য অনুসারে, পশ্চিমবঙ্গের যেকোন ক্ষেত্রে শিশু জন্মানোর পর রাজ্য সরকারের তরফে উক্ত নবজাতকের পরিবারকে একটি মূল্যবান গাছের চারা প্রদান করা হবে। এরপর শিশুর নামে ওই গাছটির নাম রাখতে হবে এবং শিশুর মতোই চারাটিকেও যত্ন সহকারে লালন-পালন করে বড় করে তুলতে হবে। শিশুটি বড় হয়ে গেলে ওই চারা থেকে তৈরি হওয়া বৃক্ষের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে ওই শিশুর।

সবুজশ্রী প্রকল্প থেকে কি কি সুবিধা পাওয়া সম্ভব?

সবুজশ্রী প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিটি নবজাতকের পরিবারকে যে চারাগাছ দেওয়া হবে সেটিকে পর্যাপ্ত যত্ন করে লালন-পালন করলে তা পরবর্তীতে মহীরুহু বৃক্ষে পরিণত হবে। আগামী দিনে শিশুর যেকোন রকম আর্থিক সমস্যা সমাধানের জন্য গাছটিকে কাজে লাগানো যেতে পারে, এমনকি গাছটি কেটেও ফেলা যেতে পারে। যেহেতু সবুজশ্রী প্রকল্পের মাধ্যমে শাল, সেগুনের মতো মূল্যবান গাছের চারা বিতরণ করা হয়ে থাকে, সুতরাং আগামী দিনে যেকোনো আর্থিক প্রয়োজনে ওই গাছটি এক মূল্যবান সম্পদ হয়ে দাঁড়াবে তা বলাই বাহুল্য। রাজ্য সরকারের তরফে প্রকাশিত তথ্য অনুসারে জানা গিয়েছে যে, রাজ্যের সাধারণ মানুষের সহায়তা সবুজ বাংলা গড়ে তোলার জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তরফে সবুজশ্রী প্রকল্প নামক এই বহুমুখী পরিকল্পনাটি কার্যকর করা হয়েছে। এই সবুজশ্রী প্রকল্পের মাধ্যমে একদিকে যেমন সবুজ বাংলা সৃষ্টি করা সম্ভব অন্যদিকে ঠিক তেমনভাবে মানব শিশুর সঙ্গে প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব, যার মাধ্যমে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ জনগণ আরও বেশি পরিমাণে গাছ লাগাতে উদ্যোগী হবে। এছাড়াও গাছটি পরিবেশকে সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি জীবজগতেও যথেষ্ট অবদান রাখবে, যা সমগ্র রাজ্যের সাধারণ জনগণের পরোক্ষভাবে উপকার করবে।

কিভাবে এই চারা গাছ পাওয়া সম্ভব?

২০১৬ সালে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে এই সবুজশ্রী প্রকল্প কার্যকর করার পর রাজ্যের জনসাধারণের উদ্দেশ্যে জানানো হয়েছিল যে, বন দপ্তরের উদ্যোগে নতুন মায়েদের হাতে এই চারা গাছ তুলে দেওয়া হবে। প্রথমে বনদপ্তরের উদ্যোগে ব্লক প্রশাসনের মারফত এই চারা গাছ প্রত্যেক নতুন নবজাতকের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে এই উদ্যোগে বেশকিছু ত্রুটি সামনে আসায় পরবর্তীতে বন দপ্তরের তরফে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, হাসপাতালের মাধ্যমেই নতুন মায়েদের হাতে সবুজশ্রী প্রকল্পের এই চারা গাছ তুলে দেওয়া হবে। অর্থাৎ বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের পর ছুটি পেয়ে বাড়ি ফেরার সময় প্রতিটি নতুন মায়ের হাতে একটি করে মূল্যবান চারা গাছ তুলে দেওয়া হয়ে থাকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফে। রাজ্য সরকারের তরফে কার্যকরী অন্য প্রকল্পগুলির মত এই প্রকল্পের আওতায় আলাদা করে নাম নথিভুক্ত করার অথবা ফর্ম পূরণের কোনোরূপ প্রয়োজন নেই।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সবুজশ্রী প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মূল যে সমস্যাটি দেখা গিয়েছিল তা হল, গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে উপযুক্ত জায়গার সমস্যা। আর জায়গা সংক্রান্ত এই সমস্যা সমাধানের জন্য পঞ্চায়েত ও পল্লী উন্নয়ন দপ্তর এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষা সংসদও এই সবুজশ্রী প্রকল্পের এক নতুন অংশীদার রূপে এগিয়ে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে হাসপাতাল থেকে গাছের চারা দেওয়া হলেও পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে নবজাতকের নামে ওই চারা গাছটি লাগানো সম্ভব হয়নি। কিন্তু সেই সমস্যা সমাধানে অগ্রগণ্য হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা সংসদ। প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, যে সমস্ত পরিবারের ক্ষেত্রে বাড়িতে গাছ লাগানোর জন্য উপযুক্ত জমি নেই অথবা একফালি অতিরিক্ত জমি না থাকার কারণে তারা কোনভাবেই সবুজ প্রকল্পের গাছটিকে লাগাতে পারছেন না তারা স্কুলের ফাঁকা জমিতে ওই গাছটি লাগাতে পারবেন।

এর ফলে একদিকে যেমন স্কুলকে ঘিরে সবুজের সমারোহ বাড়িয়ে বাচ্চাদের শৈশবের খেলাধুলার জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে, অন্যদিকে ঠিক তেমনভাবেই শিশুর নামের ওই বিশেষ চারা গাছটির খাতিরে পিতা, মাতার মধ্যে নিজের সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর তাগিদ বাড়বে। অর্থাৎ বিদ্যালয়ে চত্বরে সবুজের সমারোহ বাড়ানোর পাশাপাশি ছাত্র-ছাত্রীদের পুনরায় স্কুলমুখী করার উদ্দেশ্যেই প্রাথমিক শিক্ষা সংসদের তরফে এইরূপ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সুতরাং আপনার বাড়িতেও যদি গাছ লাগানোর জন্য উপযুক্ত জায়গা না থেকে থাকে তবে আপনিও আপনার নিকটবর্তী যেকোন সরকারি স্কুলের মাঠে সবুজশ্রী প্রকল্পের ওই চারা গাছটি রোপণ করতে পারবেন। রাজ্য সরকারের তরফে কার্যকরী এই প্রকল্পটি সমগ্র রাজ্যের জনগণ তথা সমগ্র ভারতের সাধারণ মানুষের কাছে একইভাবে সমাদৃত হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আগামী দিনে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে দূষণ কমানোর পাশাপাশি রাজ্যজুড়ে সবুজের সমারোহ বৃদ্ধি করা সম্ভব বলেই আশা রাখছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

অফিসিয়াল ওয়েবসাইট:- https://www.westbengalforest.gov.in/sabujsri.php